সংস্কারমূলক কাজে ধৈর্য অবলম্বন না করার ফিতনা

 বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌র যিনি তার মহাগ্রন্থে বলেছেন “সেই ফিতনাকে ভয় করো যা শুধু তোমাদের মাঝে যারা অত্যাচারী তাদেরকেই স্পর্শ করবে না।” আমি সাক্ষ্য দেই যে আল্লাহ্‌ ব্যতীত প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই – নেই তার কোনো সহযোগী। তিনি পরিত্রাণ পাওয়াকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন সেই ব্যক্তির জন্য যার মাঝে ৪টি আচরণ পরিলক্ষিত হবে। তিনি মহামান্বিত বলেন যেঃ “শপথ সময়ের! নিশ্চয়ই মানুষ ধ্বংসের মুখে! তারা ব্যতীত যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং একে অপরকে ডেকেছে সত্যের দিকে ও ধৈর্যের দিকে”। [আল-‘আসরঃ ১-৩] যারা ঈমান এনেছে – এটা হলো প্রথমটি। সৎকর্ম করেছে – এটি দ্বিতীয়। সত্যের পথে ডাকা ও ধৈর্যের পথে ডাকা – এই হলো তৃতীয় এবং চতুর্থ আচরণ। এবং আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে মুহাম্মাদ হচ্ছেন আল্লাহ্‌র বান্দা ও রাসূল, তিনি আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশের আস্থাভাজন বাহক। তিনি তার উম্মতকে ফিতনাসমূহের ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন – তার প্রতি আল্লাহ্‌র সালাত ও সালাম। তিনি বলেনঃ “ভাগো সব ফিতনাপূর্ণ কর্মকান্ড থেকে যা নিকষ কালো আঁধার রাতের মতো। যখন মানুষ সকালে মুসলিম হিসেবে জাগবে আর সাঁঝের পর কাফের হয়ে যাবে, সকালে কাফের হয়ে উঠবে সাঁঝে আবার মুসলিমে পরিণত হবে এবং ধর্মকে বিক্রি করে দেবে পার্থিব সব ভোগ্যের জন্য”। মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

হে আল্লাহ্‌র বান্দারা! নিশ্চয়ই বান্দার প্রতি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহসমূহের একটি হলো তাকে ফিতনা থেকে রক্ষা করা। ফলে বান্দা এর মধ্যে জড়িয়ে যায় না – কথার মাধ্যমেও নয়, কাজের মাধ্যমেও নয়। আবু হুরায়রার (রাঃ) পক্ষ থেকে বর্ণিত যে আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ“শিঘ্রই ফিতনাসমূহের আবির্ভাব হবে। তাতে বসে থাকা ব্যক্তি হবে দাঁড়ানো ব্যক্তির চেয়ে উত্তম, আর দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি তাতে হবে হেঁটে চলা ব্যক্তির চেয়ে উত্তম, আর হেঁটে চলা ব্যক্তি তাতে উত্তম হবে দৌঁড়ে যাওয়া ব্যক্তির চেয়ে। যে ব্যক্তি এতে জড়াতে চাইবে, সে এর দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। আর যে এর থেকে আশ্রয় খুঁজে পাবে, সে যেন তাই দিয়ে নিজেকে রক্ষা করে”। ইমাম বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে।

হে আমার মু’মিন ভাইয়েরা! কতই না সুখী সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ্‌ ফিতনা থেকে দূরে রেখেছেন! আল্লাহ্‌র নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ “নিশ্চয়ই সেই ব্যক্তি সুখী যাকে ফিতনা থেকে দূরে রাখা হয়েছে! নিশ্চয়ই সেই ব্যক্তি সুখী যাকে ফিতনা থেকে দূরে রাখা হয়েছে! নিশ্চয়ই সেই ব্যক্তি সুখী যাকে ফিতনা থেকে দূরে রাখা হয়েছে!” আবু দাঊদ হাদীসটি বর্ণনা করেন। আমার সম্মানিত ভাইয়েরা! যে ব্যক্তিটি তার জীবন অতিবাহিত করেছে জ্ঞান অর্জনে এবং শেখানোতে, এবং জীবন অতিবাহিত করেছে সৎকাজের আদেশ দিয়ে এবং অসৎ কাজের ব্যাপারে নিষেধ করে, এবং জীবন অতিবাহিত করেছে আল্লাহ্‌র পথে জিহাদ করে, আর তার ‘ইবাদাতের কথা যদি আসে তো সে এক মহা ব্যাপার –  বলছি সেই শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহর কথা। তিনি বলেনঃ “আর ফিতনা! তাকে চেনা যায় তার মাঝে যেসব মন্দ রয়েছে সেটা দিয়ে – যা নজরে আসে কেবল সে চলে যাওয়ার পর। কিন্তু যখন সে সামনে আসতে থাকে তখন সে থাকে সৌন্দর্যমন্ডিত, ফলে মানুষ ভাবে যে এতে রয়েছে ভালো”। এই কথা আমার ভাইয়েরা – একজন সত্যিকার ধীশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির কথা! তেমন এক ব্যক্তির কথা যিনি কুরআন, হাদীস ও আসারসমূহের ভাষ্যের ব্যাপারে অবগত। তিনি বলতে থাকেনঃ “যখন সে সামনে আসতে থাকে তখন সে থাকে সৌন্দর্যমন্ডিত, ফলে মানুষ ভাবে যে এতে রয়েছে ভালো। অত:পর যখন মানুষ এর তিক্ততা, দুর্যোগ ও হয়রানির স্বাদ পায় তখনই কেবল তার কাছে পরিষ্কার হয় এর (ফিতনার) ধোঁকাবাজির ব্যাপারে”।

হে আমার মু’মিন ভাইয়েরা! এমন এক ফিতনা রয়েছে যার ব্যাপারে বহু মানুষই খুব একটা ওয়াকিবহাল নয়। ধৈর্য না রাখার ফিতনা – সেই ধৈর্য, যার ব্যাপারে শরি’আ নির্দেশ দিয়েছে, বিশেষ করে শেষ সময় যখন সমাগত। অনেক মানুষ আছে যারা চায় সব কিছু মিনিটের মধ্যে ঠিক করে ফেলতে। তারা চায় কোনো মন্দ বা অনাচারকে সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে বদলে দিতে। কিন্তু যখন ফিতনা ছড়িয়ে পড়ে আর মানুষ দুনিয়ার ব্যাপারে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে এবং চোখের সামনে এর রেশ দেখতে পাওয়া যায় – অর্থের লিপ্সা ও দুনিয়াকে পাওয়ার লিপ্সা – এরকম অবস্থায় ধৈর্য ধারণ করা আমার ভাইয়েরা – শরি’আর দাবী। সন্দেহ নেই সেটা অনেকের জন্যই কঠিন। বিশেষ করে যখন প্রত্যেক মানুষের জন্য সুযোগ করে দেয়া হয়েছে যা খুশি তা বলার – কোনোরকম জ্ঞান ছাড়া, প্রজ্ঞা ছাড়া ও স্থান-কালের বিবেচনা ছাড়া। ফিতনা আরও বেড়ে চলেছে আধুনিক যোগাযোগের সব মাধ্যমের কারণে – বিভিন্ন রকম সামাজিক মিডিয়া ও ইলেক্ট্রনিক গেজেটের মাধ্যমে। কিছু মানুষ চেষ্টা করতে থাকে যেন তাদের অনুসারী তৈরি হয় – তাই এমন সব কথা বলতে থাকে যার মাঝে সত্য ও মিথ্যা কতখানি সে নিজেও বের করতে পারে না। এটা সে করে যাতে করে সে লোক দেখাতে পারে। দেখা যাচ্ছে প্রত্যেক লোকই গলা ছাড়তে কার্পণ্য করছে না নিজের মত অনুযায়ী। আল্লাহ রক্ষা করুন। অনেক সময় একজন মুসলিম ফিতনায় পড়ে যায় অথচ সে তা বুঝতেও পারে না, বিশেষ করে যখন তার জ্ঞান স্বল্প অথচ তার বহু অনুসারী ও ভক্ত বেড়ে যায়। আল্লাহ্‌র কাছ থেকে এ থেকে পরিত্রাণ ও সুরক্ষা প্রার্থনা করি।

আমার মু’মিন ভাইয়েরা! অবস্থার পরিবর্তনের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করা বা অবস্থার সংশোধনের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করা হচ্ছে বীরত্ব ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। এর মাঝে মোটেও কোনো কাপুরুষতা বা হতাশা নেই যেমনটা কিছু নির্বোধ মনে করে থাকে। বিপ্লবী পরিস্থিতি অনেক মানুষকেই প্রভাবিত করে ফেলেছে। এই ধরণের পরিস্থিতিতে সবকিছুই সঠিকে পরিণত হয়েছে, যা কিছুই এই বিপ্লবী পরিবেশকে সমর্থন করে না – তার নাম নিতে মানুষ ভয় পায়,  সেই বিপ্লবের কোনো ভুলত্রুটি নিয়ে তো নয়ই। কেন? হে মুসলিম ভাই, হে জ্ঞান অন্বেষণকারী, হে ‘আলেম, হে বিচারক, হে আল্লাহ্‌র পথে আহ্বানকারী, সত্যকে তুলে ধরুন আল্লাহকে খুশি করার জন্য – কাউকে এরপর ভয় করার প্রয়োজন নেই। কিছু মানুষ আছে যারা লোকেদের কর্মকান্ডের ভুল তুলে ধরতে ভয় পায় যে তারা তার ওপর ক্ষিপ্ত হবে। এবং তার ব্যাপারে বলবে যে – ও তো হচ্ছে এই সেই! যদি আল্লাহ্‌ আপনার কাজে খুশি থাকেন এরপর আর কীইবা আপনার ক্ষতি করতে পারে? যে ব্যক্তি শরি’আর ভাষ্য ঠিকমতো জেনেছে এবং একে তার পথের আলো হিসেবে গ্রহণ করেছে – জেনেছে এর অর্থ হলো পড়াশোনা করেছে, শিখেছে এবং এরপর বিশ্বাস করেছে – কেননা কিছু লোক প্রথমে বিশ্বাস করে তারপর দলিল খোঁজে, এটা ভুল – বরং জানো, পড়, দলিল বের কর তারপর বিশ্বাস করো – এটাই হচ্ছে সঠিক। তো যে ব্যক্তি শরি’আর ভাষ্য ঠিকমতো জেনেছে সে নিশ্চয়ই ফিতনার সময়ে নিজেকে বাঁচানোর রাস্তা বা উপায় খুঁজে পাবে। যে ইতিহাস পড়েছে এবং এতে যা আছে তা নিয়ে চিন্তা করেছে ও মানুষের অবস্থার দিকে খেয়াল করেছে সে খুব ভালো করেই বুঝবে যে যখন ধৈর্য ধারণের আদেশ দেয়া হয়েছে তখন ধৈর্য ধারণ করা সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। জি আমার ভাইয়েরা! শরি’আ ধৈর্য ধারণের আদেশ দিয়েছে ফিতনাপূর্ণ অবস্থায় যখন সমস্যা ও সন্দেহ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। সুন্নতের পথে চলা তরুণদের আজ ধৈর্য ধারণ করতে শেখার কতই না দরকার! কতই না দরকার তাদের অপরের সাথে আচরণের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করতে শেখা। তাদের পূর্বের পূণ্যাত্মাদের জীবনী পড়তে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না ধৈর্য একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। ঠিক যেমন বিপ্লবকে ঘিরে একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়, একইভাবে আমাদের চাই ধৈর্যের সংস্কৃতি। ভাইয়েরা এই ব্যাপারটি শরি’আরই একটি দাবী। এই ব্যাপারে যে সমালোচনা করে তার জ্ঞানের দিকে তাকাও – সে কি একজন জ্ঞানী লোকদের মধ্যে গণ্য? কেননা এসব ফিতনাকে গভীর ভাবে বুঝতে পারে কেবল জ্ঞানী ব্যক্তিরাই – যাদের রয়েছে দূরদৃষ্টি।

ধৈর্য ধারণের যে আবশ্যিকতা তাকে খাটো করে দেখার ফিতনা এবং এই ধারণা পোষণ করা যে ধৈর্য মানেই হচ্ছে ক্ষুদ্রতা, ছোট হয়ে থাকা, স্বাধীনতা বা প্রশস্ততা থেকে দূরে সরে যাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি – কোথা থেকে এসেছে এসব কথা বার্তা? আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং তার সাথে যে সাহাবীরা ছিলেন – তাদের স্বাধীনতা কোনো কোনো সময় আটকে দেয়া হয়েছিলো। আপনারা কি পড়েননি কী হয়েছিলো তার সাথে শি’ব আমেরে? দুই বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছিলো তাকে এবং তার সাহাবীদের – তারা শুকিয়ে যাওয়া চামড়া খেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এটা কী খাটো হয়ে থাকা? আল্লাহ্‌র শপথ, না! এটাই হচ্ছে ইজ্জত! আল্লাহ্‌ বলেনঃ “ইজ্জত তো আল্লাহ্‌, তার রাসূল ও বিশ্বাসীদের জন্যই কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না”। [আল-মুনাফিকুনঃ ৮] আল্লাহ আরও বলেনঃ “এবং নিরাশ হয়ো না ও দুঃখ করো না, তোমরাই জয়ী হবে”। কিন্তু কখন? শর্ত রয়েছে – “যদি মু’মিন হয়ে থাকো”। [আলে ‘ইমরানঃ ১৩৯] ধৈর্য মোটেই ছোট হওয়া নয়, বা বড়ত্ব থেকে নেমে আসা নয়। নবীজীর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনী এমন সব ঘটনা দিয়ে ভরপুর যাকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে – বিশেষ করে যার জ্ঞান নেই সে বলবে যে এটা তো খাটো হয়ে থাকা – আমরা আল্লাহ্‌র কাছে পরিত্রাণ চাই এধরণের ভাবনা থেকে। যে কেউ ইতিহাস তৈরি করার চেষ্টা করেছে ধৈর্য ধারণ না করে এবং সংস্কারমূলক কাজে তড়িঘড়ি করে সবসময়ই পরিস্থিতিকে সে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যা কখনই মুসলিমদের জন্য ইতিবাচক হয়নি।

শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ-র বক্তব্যে ফিরে আসি – বলে রাখা ভালো যে এই বিষয়ে তার প্রচুর বক্তব্য রয়েছে, যা প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দিয়ে মোড়া। আমি এর খুব কমই বাছাই করে এনেছি। তিনি “মিনহাজ আস-সুন্নাহ”-তে বলেনঃ “এমন কোনো দল প্রায় পাওয়া যায় না বললেই চলে যারা সুলতানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে তার অনাচার রোধে কিন্তু তাদের নিজেদের অনাচার যে অনাচার তারা রোধ করতে চেয়েছিলো তার চেয়ে বড় হয়নি। ফলে না তারা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, না তারা দুনিয়াকে ধরে রাখতে পেরেছে”। তিনি আরও বলেনঃ“বেশিরভাগই যারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তারা মূলত নেতাদের হঠিয়ে নিজেরা সেই নেতৃত্বের সুবিধাগুলো ভোগ করতে চায়। বাইরে থেকে মনে হয় তারা এটা করছে দ্বীনের জন্য বা শরি’আর জন্য, কিন্তু সত্য হচ্ছে যে বেশিরভাগ সময়ই এই বিরোধিতা বা আন্দোলন মূলত অর্থের জন্যই, পার্থিব জীবনকে সমৃদ্ধ করার জন্যই।” শায়খুল ইসলাম বলতে থাকেনঃ “নেতাদের অর্থলিপ্সা থেকেই অন্যান্য গর্হিত কাজ আরম্ভ হয়। যারা নেতাদের এই আয়েশি অবস্থা দেখে ধৈর্য ধারণ করতে পারে না তাদের মূল রাগটা থাকে  নেতাদের এই অর্থলিপ্সার ওপর যা অন্যান্য গর্হিত কাজকে আরও উসকে দেয়। তারা যখন কথা বলে তখন তারা এই অর্থলিপ্সার কথা বলে না যেটা তাদের নিজেদেরও রয়েছে, অন্যান্য সব অনাচারের কথাই মূলত বলতে থাকে। ফলে নেতাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীরা ধারণা করতে থাকে যে তারা এই যুদ্ধ চালাচ্ছে যাতে ফিতনা না থাকে এবং দ্বীনের পুরোটা যেন আল্লাহ্‌র জন্য বরাদ্দ থাকে। কিন্তু আসলে যে জিনিসটি তাদের সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করেছে সেটি হলো তাদের নিজেদের মতলব – হয় অর্থ অথবা নেতৃত্ব।” তাই আসুন, এসব আবেগ পরিত্যাগ করি, কারণ এটাই বাস্তবতা।

শায়খুল ইসলাম “মিনহাজ আস-সুন্নাহ”-তে যা বলেছেন তার সারসংক্ষেপ হলো – সাধারণ রীতিমাফিক সুলতানের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহগুলো সাধারণত হয়ে থাকে সুলতানদের যে অর্থকড়ি সেগুলো করায়ত্ত করার অভিপ্রায়েই বা নেতৃত্ব অর্জনের জন্যই। আর এটি হচ্ছে দুনিয়ার জন্য করা লড়াই, মোটেও আল্লাহ্‌র বাণীকে উচ্চে তুলে ধরার জন্য যে লড়াই তা নয়। হুযায়ফা (রাঃ) – বিরাট এক সাহাবী – বলেনঃ “তোমরা সতর্ক থাকো ফিতনাসমূহের ব্যাপারে। কেউ যেন এর মুখোমুখি না হয়। আল্লাহ্‌র শপথ! যে ব্যক্তিই এর মুখোমুখি হয় এটি তাকে সেভাবে ভাসিয়ে নিয়ে যায় যেভাবে বান পথের ময়লাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নিশ্চয়ই এই ফিতনাসমূহ হচ্ছে অস্বচ্ছ ও সন্দেহযুক্ত । মূর্খ বলবে এটি হচ্ছে সুন্নাহ, কিন্তু চলে যাওয়ার পর এর আসল রূপ বেরিয়ে আসবে। যদি তাকে দেখো তবে ঘর আঁকড়ে থাকো, তরবারি ভেঙ্গে ফেলো, এবং জমায়েত উঠিয়ে দাও ”

বিষয়টি আমার ভাইয়েরা – জ্ঞানের দাবী রাখে। দাবী রাখে স্থিরতার, দাবী রাখে হিসেব নিকেশের। একারণেই আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’আলা ফিতনাসমূহ বোঝার ব্যাপারে গন্তব্যস্থল হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন শরি’আর ‘আলেমদের। তিনি বলেনঃ “আর যখন তাদের কাছে কোনো বিষয় আসে সুরক্ষার বা আতংকের, তারা সেটা প্রচার করে দেয়। যদি তারা বিষয়টি রাসূলের কাছে অথবা তাদের মাঝে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের কাছে নিয়ে যেত, তবে এদের মাঝে যে অনুসন্ধানকারী সে জেনে দিতো”। [আন-নিসাঃ ৮৩] আল্লাহ্‌র কাছে পথভ্রষ্টকারী ফিতনাসমূহ থেকে পরিত্রাণ চাইছি।

প্রিয় ভাইয়েরা, এই যে মূলনীতির কথা আমি উল্লেখ করছি এটা সুন্নাহ অবলম্বনকারীদের অজানা নয়। এটি এই জন্য বলা হচ্ছে না যাতে করে মিথ্যা বা বাতিলকে সত্য হিসেবে চালিয়ে দেয়া হয়। এজন্যেও বলা হচ্ছে না যাতে করে মানুষ সৎকর্মের আদেশ দেয়া ও অসৎকর্মকে নিষেধ করার যে দায়িত্ব তা বাদ দিয়ে দেয়। আল্লাহ্‌র শপথ! মোটেও তা নয়। বরঞ্চ সৎকর্মের দিকে আহ্বান করা ও অসৎকর্ম থেকে দূরে থাকতে বলা একটি অবশ্য করণীয় দায়িত্ব – কিন্তু সেটা করতে হবে শরি’আর পন্থাবলম্বনে, এবং নবীর দেখানো পথ অনুযায়ী এবং আমাদের বিগত সৎকর্মশীল মানুষদের পদ্ধতিতে। ভাইয়েরা! একজন মুসলিম বা মু’মিন যে আল্লাহকে ভয় করে –  সে যেকোনো জায়গায় যখন কোনো অনাচার দেখবে তার দায়িত্ব হচ্ছে সেটা সংশোধনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু মহামহিম আল্লাহ্‌ বলেনঃ  “আর তোমরা বাড়িতে প্রবেশ করো তার দরজাসমূহ দিয়ে”। [আল-বাকারাহঃ ১৮৯] সুতরাং একজন মুসলিমকে অবশ্যই শরি’আ যে পথ (অর্থাৎ বাড়ির দরজা) বেঁধে দিয়েছে তার অনুসন্ধান করতে হবে। এই শরি’আ হচ্ছে পবিত্র শরি’আ, স্বচ্ছ শরি’আ। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’আলা অবস্থার পরিণতি সম্পর্কে জানেন, আমরা তো তা জানি না! তিনি আমাদের কোনো কিছু করতে বাধ্য করেন না যাতে আমাদের কল্যাণ রয়েছে সেটি ব্যতীত। তাই যখন আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য ধৈর্যকে ধার্য করে দিলেন, এটাও আমাদের ভালোর জন্যই। ইতিহাস তো পরিপূর্ণ সেসব ঘটনা দিয়ে যেখানে দেখা যাবে যে, যখনই তাড়াহুড়ো করা হয়েছে এবং ধৈর্যকে জলাঞ্জলি দেয়া হয়েছে তার ফলাফল হয়েছে তিক্ত এবং মুসলিমদের জন্য নেতিবাচক।

এসব কথা আমি এই জন্যই বলছি, ভাইয়েরা, যাতে মানুষ মনে না করে যে আমার উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সংস্কারমূলক কাজ ছেড়ে দিতে বলা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ পরিত্যাগ করতে বলা। না, এটা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য রয়েছে সমুচিৎ কর্মসূচী। প্রত্যেকের জন্য তাই দায়িত্ব হলো যে সে যেন শরি’আর জ্ঞান রাখে যা তাকে সক্ষম করে তুলবে সংস্কারমূলক ও সংশোধনমূলক কর্মকান্ডে সঠিক কর্মপন্থা হাতে নিতে, যাতে কাজ শেষে এমন না হয় যে ফলাফল দাঁড়ালো মন্দ অথচ সে বুঝতে পারল না। যাকে দ্বিতীয় শায়খুল ইসলাম বলা হয় – সেই ইবনুল কায়্যিম (রঃ ) তার গ্রন্থ “ই’লাম আল-মুওয়াক্কি’ঈন”-এ বলেনঃ “যে ব্যক্তি ইসলামের ওপর বয়ে যাওয়া ছোট-বড় ফিতনাসমূহ নিয়ে চিন্তা করবে এবং এটাকে ধৈর্যের এই নীতিকে পরিত্যাগ করে মূল্যায়ণ করবে এবং সেভাবেই এটাকে দূর করতে চাইবে, তার থেকে কেবল উক্ত ফিতনার চেয়ে বড় সমস্যাই তৈরি হবে”। এ হচ্ছে সেসব ‘আলেমদের বক্তব্য যাদের জ্ঞানের ব্যাপারে সকল পন্ডিতরাই একমত! শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তার চমৎকার গ্রন্থ “আল-ইস্তিকামাহ”-তে বলেনঃ “ফিতনা কখনই আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা পরিত্যাগ করা ব্যতীত হয় না। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু আদেশ করেছেন সত্যের এবং আদেশ করেছেন ধৈর্যের! সুতরাং ফিতনা দেখা দেয় – হয় সত্যকে উপেক্ষা করার কারণে অথবা ধৈর্যকে উপেক্ষা করার কারণে!” কী কথা, হে আমার ভাইরা! এসব কথার পেছনে নবীর শিক্ষার প্রভাব আঁচ করা যায়।

হে আমার মু’মিন ভাইয়েরা! ধৈর্য ছেড়ে দেয়ার অর্থ কী? যে ধৈর্যকে ধারণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেটাকে ছেড়ে দেওয়ার অর্থ হলো কারও কারও এই ধারণা করা যে অনাচার যাই হোক না কেন এটাকে দূর করার একমাত্র পথ হলো ময়দানে নামা বা বিদ্রোহ করার মাধ্যমে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে পালটে দেয়ার মাধ্যমে – শরি’আর বিধানসমূহের কোনো তোয়াক্কা না করে এবং মানুষের কল্যাণ ও অকল্যাণের দিকে বিন্দুমাত্র দৃষ্টি না দিয়ে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এমন সব ঘটনার যা প্রমাণ করে যে যারা কিনা শক্তি প্রয়োগ ও সংঘর্ষের পথ বেছে নিয়েছে সংস্কারমূলক কাজে তারা এমন সব ফিতনা ও সমস্যার দিকে উম্মতকে টেনে নিয়ে গেছে যার মোকাবেলা করার সামর্থ উম্মতের নেই! আল্লাহ্‌ কখনই এমন কোনো কাজ করতে আদেশ করেননি, তার রাসূলও (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এমন কিছু করতে বলেননি। এধরণের হঠকারি কাজ নীতিগতভাবে শরি’আ বিরোধী। আর যদি বাস্তবতাই সাক্ষ্য দেয় যে এসব কাজ আসলে ফিতনার ওপর ফিতনা তাহলে আর কী বলার থাকে?

[লেখাটি আসলে একটি খুতবা যা আমি শুনে শুনে অনুবাদ করেছি। পাঠোপযোগী করার জন্য অর্থের দিকে খেয়াল রেখে অল্পবিস্তর পরিবর্তন করা হয়েছে। খুতবাটি দিয়েছিলেন শায়খ সুলতান বিন হামাদ আল-‘উওয়াইদ (রঃ), তিনি ছিলেন দাম্মামের একজন ইমাম] 

লিখাটি সংগৃহীত হয়েছে ঃhttp://sibgat.wordpress.com/2013/05/30/losing-patience-in-reformation/

[মূল খুতবা এখানে পাবেন। শায়খ সুলতান গত ডিসেম্বরে সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল-ফিরদাউস দিন]

Advertisements

Posted on জুন 18, 2013, in আকিদাহ. Bookmark the permalink. এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s